রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংক্ষিপ্ত জীবনী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবী ঠাকুর -ছিলেন
অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক,
প্রাবন্ধিক, সংগীতস্রষ্টা, কণ্ঠশিল্পী, নাট্যকার, অভিনেতা, ছোটগল্পকার,
চিত্রকর ও দার্শনিক। আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-এ তার "অভিলাষ" কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশিত রচনা। তাঁর ১৩টি উপন্যাস ৩৮টি নাটক ৫২টি কাব্যগ্রন্থ ৩৬টি প্রবন্ধ ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্র
রচনাবলী যা ৩২ খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে তাঁর আঁকা প্রায় দুই হাজার ছবি।
রবীন্দ্রনাথকে “গুরুদেব”, “কবিগুরু” ও “বিশ্বকবি” অভিধায় ভূষিত করা হয়।
তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি এশীয়দের মধ্যে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি সমাজ উন্নয়নের উপায় হিসেবে গ্রামের উন্নয়ন ও গ্রামের দরিদ্র মানুষ কে শিক্ষিত করে তোলার পক্ষে মতপ্রকাশ করেন। এর পাশাপাশি সামাজিক ভেদাভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
![]() |
| কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর |
পারিবারিক পরিচিতি
ঠাকুরদের আদি পদবী কুশারী। কুশারীরা ভট্টনারায়ণের পুত্র দীন কুশারীর বংশজাত। দীন কুশারী মহারাজ ক্ষিতিশূরের নিকট কুশ (বর্তমান বর্ধমান জেলা) নামক গ্রামের অধিবাসী হন ও কুশারী নামে খ্যাত হন। পরবর্তীকালে কুশারীরা বঙ্গদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েন। যশোরের ঘাটভোগ- দমুরহুদা থেকে খুলনার পিঠাভোগ পর্যন্ত। পিঠাভোগের কুশারীরাই এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও অবস্থাপন্ন হয়ে ওঠে।
জন্ম
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে (৭ মে ১৮৬১ – ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু ( ১৮১৭ সালে জন্মগ্রহণ এবং ১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন) এবং মাতা ছিলেন সারদা সুন্দরী দেবী (১৮২৬ – ১৮৭৫)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরা ১৫ জন ভাইবোন ছিল এবং ১৫ ভাইবোনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পিতামাতার চতুর্দশ অর্থাৎ ( ১৪) তম সন্তান। ১৮৭৫ সালে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের মাতৃবিয়োগ ঘটে। পিতা দেবেন্দ্রনাথ দেশভ্রমণের নেশায় বছরের অধিকাংশ সময় কলকাতার বাইরে অতিবাহিত করতেন। তাই ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হয়েও রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছিল ভৃত্যদের অনুশাসনে। ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাগান বাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে রবীন্দ্রনাথ বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করতেন। ১৮৭৩ সালে এগারো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
শিক্ষাজীবন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটো থেকেই অত্যন্ত জ্ঞানী ছিলেন, তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছিল কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স নামে বিখ্যাত স্কুলে। কিন্তু বিদ্যালয়- শিক্ষায় অনাগ্রহী হওয়ায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে তার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার বাবা চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে ব্যারিস্টার বানাতে। তাই ১৮৭৮ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে যান রবীন্দ্রনাথ। ১৮৭৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু সাহিত্যচর্চার আকর্ষণে সেই পড়াশোনা তিনি সমাপ্ত করতে না পেরে অবশেষে ১৮৮০ সালে প্রায় দেড় বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে কোনো ডিগ্রি না নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়া শুরু না করেই তিনি দেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তিনি সংগীত, অভিনয় এবং অঙ্কন বিষয়ও শিক্ষা লাভ করেন। শিক্ষা গ্রহণ এর পর ১৯০১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত শান্তিনিকেতন একটি পরীক্ষামূলক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান করেন সেখানে তিনি নিজে শিক্ষক হিসাবে কাজ করতেন ১৯২১ সালে এই স্কুলটি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় নামে প্রতিষ্ঠা করেন।
বৈবাহিক জীবন
মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর (২৪ অগ্রহায়ণ, ১২৯০ বঙ্গাব্দ) ঠাকুরবাড়ির অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে রবীন্দ্র নাথের বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহিত জীবনে ভবতারিণীর পুণরায় নামকরণ করা হয় এবং তাঁর নাম পাল্টে রাখা হয় মৃণালিনী দেবী ( ১৮৭৩ – ১৯০২)। ১৯০২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী মারা যান। রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনীর সন্তান ছিলেন পাঁচ জন মাধুরীলতা ( ১৮৮৬ – ১৯১৮), রথীন্দ্রনাথ ( ১৮৮৮ – ১৯৬১), রেণুকা ( ১৮৯১ – ১৯০৩) সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কন্যা রেণুকা ইহলোক ত্যাগ করেন, মীরা ( ১৮৯৪ – ১৯৬৯) এবং শমীন্দ্রনাথ( ১৮৯৬ – ১৯০৭) সালের ২৩ নভেম্বর কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়। এঁদের মধ্যে অতি অল্প বয়সেই রেণুকা ও শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু ঘটে।
কর্মজীবন
মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা- এ তার" অভিলাষ" কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশিত রচনা। ষোল বছর বয়সে তার" ভিখারিণী" গল্পটি( ১৮৭৭) বাংলা সাহিত্যের প্রথম ছোটগল্প। ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ তথা প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ কবিকাহিনী। ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথের অপর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মানসী প্রকাশিত হয়। কুড়ি থেকে ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে তার আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ও গীতিসংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলি হলো প্রভাতসংগীত, শৈশবসঙ্গীত, রবিচ্ছায়া, কড়ি ও কোমল ইত্যাদি। ১৮৯১ সাল থেকে পিতার আদেশে নদিয়া (নদিয়ার উক্ত অংশটি অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলা), পাবনা ও রাজশাহী জেলা এবং উড়িষ্যার জমিদারিগুলির তদারকি শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ। কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছিলেন। জমিদার রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে" পদ্মা" নামে একটি বিলাসবহুল পারিবারিক বজরায় চড়ে প্রজাবর্গের কাছে খাজনা আদায় ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে যেতেন। গ্রামবাসীরাও তার সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করত। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহ ছেড়ে চলে আসেন বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে শান্তিনিকেতনে।
রাজনীতি
১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ- বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন।যখন ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, তখন তিনি এই গণহত্যার তীব্র বিরোধিতা করেন। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণহত্যা ছিল। রবীন্দ্র নাথের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ছিল বিরূপ প্রতিক্রিয়া ১৯৩৪ সালে বিহার প্রদেশে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুকে গান্ধীজি "ঈশ্বরের রোষ" বলে অভিহিত করলে, রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজির এমন বক্তব্যকে অবৈজ্ঞানিক বলে চিহ্নিত করেন এবং প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করেন।
কবির অর্জন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জীবনে অনেক কৃতিত্ব বা সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন, তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল “ গীতাঞ্জলি ” একটি কবিতার সংকলন, যাতে মোট ১০৩টি কবিতা রয়েছে, এই কাজের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতকে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে দিয়েছেন, যা প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়, ভারতের “ জন- গণ- মন ” এবং বাংলাদেশের “ আমার সোনার বাংলা” গাওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৫ সালে নাইট উপাধি পেয়েছিলেন কিন্তু পরে তিনি ব্রিটিশ সরকারকে ফিরিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনে তিনবার আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো একজন মহান বিজ্ঞানীর সাথে দেখা করেছিলেন, যিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে রাব্বি ঠাকুর বলে ডাকতেন ।
মৃত্যু
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ আগস্ট ১৯৪১ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ দুপুর ১২টা ১০মিনিটে কলকাতার জোড়াসাঁকোয় ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন । তিনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি মৃত্যুর পরেও আজো সকলের হৃদয়ে বিরাজমান ।

কোন মন্তব্য নেই